ডাংকি মুভি রিভিউ

Disclosure: This content is reader-supported, which means that if you click on some of our links. then we may earn a commission.
বলিউডের অন্যতম শ্রেষ্ট পরিচালক রাজকুমার হিরানীর সাথে ফিরছে বলিউড বাদশা~👑

◾সাম্প্রতিক সময়ে বলিউডে আবারো আলোচনার তুঙ্গে পরিচালক রাজু হিরানী তথা রাজকুমার হিরানীর নাম। কে এই রাজকুমার হিরানী? কেউ যদি এই প্রশ্ন করেন, তার জবাবে আমি একটা উত্তরই লিখবো। আর সেটা হলো রাজকুমার হিরানী হচ্ছে "দ্য মাস্টার মেকার"।
{tocify} $title={Table of Contents}
 স্বকীয় বৈশিষ্ট্যে নিজের অনবদ্য নির্মাণশৈলির কারণে হলিউড বিখ্যাত পরিচালক কোয়েন্টিন টারান্টিনো যতটা জনপ্রিয়। তদ্রুপ বলিউডে রাজকুমার হিরানীও ততটুকু জনপ্রিয়। যদি আরো সহজ করে বলি তবে তার অর্থ এই যে, বলিউডে রাজকুমার হিরানীর মতো আরেকটা গুণী পরিচালক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর!
ডাংকি রিভিউ
(image credit: jio studio)


◾কারন রাজকুমার হিরানী কখনো টাকার নেশায় অন্য পরিচালকদের মতো বছরে চার পাঁচটা সিনেমা নির্মাণ করেননি এবং করেননা। তাছাড়া তিনি কখনো টাকার পিছনে ছুটেছেন বলেই মনে হয়না, কারন আপনি লক্ষ্য করলে দেখবেন টাকাই তার পিছনে ছুটেছে। বলিউডে রাজু হিরানী উদয় হওয়াটাই ছিল ভিন্নভাবে। মা নার্গিস দত্তের মৃত্যু শোকে মাদকে নেশায় যখন ধংশে দ্বারাপ্রান্তে, অভিনেতা এবং রাজনীতিবীদ সুনীল দত্তের একমাত্র সন্তান সঞ্জয় দত্তের। তার উপর আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন দাউদ ইব্রাহিমের সাথে যোগসাজশের জেরে, যখন বলিউডে নিজের ভবিষ্যত বলে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকার সম্ভবনা রইল না অভিনেতা সঞ্জয় দত্তের। তখন রাজু হিরানী সেই সঞ্জয় দত্তকে নিয়েই ২০০৩ সালে নির্মাণ করেন নিজের প্রথম সিনেমা "মুন্না ভাই এম.বি.বি.এস." ! 

কেমন সিনেমা মুন্না ভাই এম.বি.বি.এস.~?

◾বাবার স্বপ্ন ছেলে মুন্না পড়ালেখা করে এমবিবিএস ডিগ্রি নিয়ে হবে নামকরা বড় ডাক্তার। যার উদ্দেশ্যে ছেলে মুন্নাকে পাঠানো হয় মুম্বাই শহরে। কিন্তু মুম্বাইয়ে এসে ডাক্তারি জ্ঞাণ হাসিলের বদলে, মুন্না রপ্ত করে নেয় মারামারি পিঠাপিঠির কু-জ্ঞান! অতপর মুন্না হয়ে উঠে মুন্নাভাই তথা শহরের ডন। এই ছিল সিনেমাটির মোটামুটি কাহিনি।

◾তো, যথারীতি মুন্না ভাই এম.বি.বি.এস.-সিনেমাটি মুক্তি লাভের পর বক্সঅফিসে রীতিমতো মতো ঝড় তুলে! তাছাড়া সমালোচকদের প্রশংসার ফুলঝুরি তো ছিলই। সেই সুবাদে মামলা, হামলা এবং সমালোচনা অতল গভীরে তলিয়ে যাওয়া, নার্সিস-সুনীল দম্পতির একমাত্র ছেলে সঞ্জুবাবা তথা সঞ্জয় দত্তের ক্যারিয়ারে চার চাঁদ লেগে যায় এক পরিচালক রাজু হিরানীর বদৌলতে।

◾এইতো গেলো রাজু হিরানী উত্থান এবং বলিউডের ব্যাড বয় সঞ্জুবাবার ক্যারিয়ার টিকে যাওয়ার গল্প। অতপর ২০০৩-২০০৬ সালের সময় সালের মধ্যে দীর্ঘ আড়াই বছরেরও বেশি বিরতি নিলেন রাজু হিরানী। অতপর ২০০৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর আবারো ফিরলেন সঞ্জয় দত্তকে নিয়ে MBMBBS-সিনেমার দ্বিতীয় কিস্তি "লাগে রাহো মুন্না ভাই"-সিনেমা নিয়ে। তো মুক্তি লাভের পর লাগে রাহো মুন্না ভাই-সিনেমাও জয় করে নিলো দর্শক সমুদ্বয়ের মন। যার ফলাফল স্বরুপ শেষ পর্যন্ত ব্লকবাস্টার তকমা নিয়ে হল থেকে ফিরলো সঞ্জুবাবা। অন্যদিকে রাজু হিরানী নিলেন আবারো দীর্ঘ প্রায় তিন বছরের বিরতি।

◾অতপর ২০০৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর রাজু হিরানী ফিরলেন। তবে এবার সাথে সঞ্জুবাবা নয়। বরং আমির খান, কারিনা কাপুর, আর মাধবন, শারমান জোশি এবং প্রফেসর ভাইরাস তথা বলিউডের অন্যতম সেরা অভিনেতা বোমান ইরানীকে নিয়ে। এবার কোনো ডাক্তার বা ডনের গল্প নয়। বরং এবারের গল্প হচ্ছে একটি কলেজ, কলেজের অসংখ্য শিক্ষার্থীর ভিড়ে ভিন্ন ভিন্ন পরিবারের চারজন ছেলে তথা ছাত্র, একজন প্রফেসর ভাইরাস, এবং তার ছোট মেয়ে পিয়া সাহাস্ত্রবুদ্ধে-সহ আরো বেশ কয়েকজনের গল্প। কিন্তু গল্পে মূল নায়ক হচ্ছে র‍্যাঞ্চো, তবে উক্ত গল্পে বাকিদের অবদানও কোনো অংশে কম নয। এবং এই গল্পের নাম "থ্রি ইডিয়টস"।

◾হ্যা এতক্ষণ বলছিলাম বলিউডের সেই কালজয়ী সিনেমা থ্রি ইডিয়টসেরই কথা। যে সিনেমাকে আজ পর্যন্ত পরিচালক রাজকুমার হিরানী জীবনের অন্যতম সেরা কাজ বলে বিবেচনা করা হয়। তো যথারীতি "থ্রি ইডিয়টস"-সিনেমাটি মুক্তি লাভের পর, সেটি দেখার জন্য সিনেমা হলের টিকিট কাউন্টারের সামনে দর্শকের দীর্ঘ লাইন লেগে যায়। এবং সিনেমা দেখে হল থেকে বের হওযা প্রতিটা দর্শকের মুখে মুখে উচ্চারিত হতে থাকে পরিচালক রাজু হিরানী নামে প্রশংসার ফুলঝুরি। তাছাড়া বক্সঅফিসেও অর্জন করে হিংসা করার মতো সাফল্য। এবং সিনেমায় র‍্যাঞ্চো চরিত্রে অভিনয়ের সুবাদে আমির খান রাতারাতি বনে যান ছাত্রদের আইডল। অন্যদিকে পরিচালক রাজু হিরানী আবারো হারিয়ে যান প্রায় পাঁচ বছর সময়কালের অতল গভীরে!

◾তো, দীর্ঘ পাঁচ বছর সিনেমা নির্মাণ করা থেকে বিরত থাকার পর। ২০১৪ সালের ১৯ ডিসেম্বর আবারো ফিরেন তার সাড়াজাগানো সিনেমা "পিকে" তথা মাতাল নিয়ে। এবারও সঙ্গী পাঁচ বছর আগের নির্মিত থ্রি ইডিয়টস-সিনেমার র‍্যাঞ্চো তথা আমির খান। তবে এবারের গল্পতো আরো ভিন্ন শুধু ভিন্নই নয়, বরং বলা চলে পিকে-সিনেমাটি পরিচালক রাজু হিরানী কতৃক নির্মিত সিনেমাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ইউনিক স্ক্রিপ্টেট এবং অত্যান্ত রিস্কি একটি প্রজেক্ট। কেন রিস্কি প্রজেক্ট? এই প্রশ্নের জবাবে কিছু লিখার প্রয়োজন আছে বলে মনো করিনা। কারন পিকে সিনেমাটি যারাই দেখেছে তারা বিষয়টি খুবই ভালো করে জানে। তারপরও আমি ছোট করে বলছি শুনুন। আমাদের উপমহাদেশে ধর্ম ব্যাবসাটা খু্বই রমরমা ভাবেই চলছে। ধর্মের নামে সহজ সরল মানুষকে বোকা বানিয়ে ভন্ড প্রতারকেরা হাতি নিচ্ছে মানুষের সর্বস্ব। রাজু হিরানীর পিকে সিনেমার গল্পও ঠিক এরকম ধর্ম ব্যাবসায়ীদের ভন্ডামি নিয়ে। তবে সেখানে ভিকটিম কোনো মানুষ নয়, বরং ভিন্নগ্রহ থেকে আগত এক এলিয়েন। যে কোনো কারনে তার সহকর্মী সমেত তাদের স্পেসশিপে চড়ে এসেছিল পৃথিবীতে। এবং পৃথিবীতে আসা মাত্রই চুরির শিকার হয়ে হারিয়ে ফেলে নিজের রিমোট কন্ট্রোলার! যার সাহায্য নিজ গ্রহে ফেরার কথা ছিল এলিয়েন পিকের। সিনেমাটি মূলত এলিয়েন পিকে এবং তার চুরি হয়ে যাওয়া রিমোট কন্ট্রোলরটি উদ্ধারের গল্পের উপর ভিত্তি করে নির্মাণ করেছিল পরিচালক রাজু হিরানী। তবে সিনেমাটির গল্পে এমন কিছু ছিল যা প্রতি নিয়ত চপাট চপাট করে আঘাত করেছিল ধর্ম ব্যাবসায়ী ধন্ড প্রতারকদের গালে। যার জেরে সিনেমাটির অভিনেতা আমির খানকে কিছুদিনের জন্য ছাড়তে হয়েছিল ভারত। তাছাড়া সিনেমার পরিচালক রাজু হিরানী উপর ধর্ম ব্যাবসায়ী ভন্ডদের গালাগালি এবং হুমকি ধামকির ফুলঝুরি তো অনবরত বর্ষণ হয়েছিলই মুষলধারে বৃষ্টির মতো।

◾সে যাইহোক, ভন্ডদের শত বাঁধা বিপত্তি থাকলেও। সাধারান দর্শক সেগুলো কানেই তুলেনি। যার ফলাফল স্বরুপ ১২২ কোটি রুপিতে নির্মিত পিকে সিনেমাটি বক্সঅফিসে অসংখ্য রেকর্ডের বন্য বয়ে দেয়! এবং ভারতে তথা ডমেস্টিকে প্রথম বারের মতো কোনো ভারতীয় সিনেমা হিসেবে ৩০০ কোটি রুপি নেট কালেকশন সহ, বিশ্বব্যাপি আয় করে নেয় ৭৫০ কোটির রুপির মতো। তাছাড়া বিভিন্ন ক্রিটিক্সদের প্রশংসা তো ছিলই। অন্যদিকে পিকে সিনেমার সুবাদে ভারতের গন্ডি ছাড়িয়ে বিশ্বব্যাপি হুরহুর করে বাড়তে থাকে অভিনেতা আমির খানের ফ্যান্সব্যাজের সংখ্যা। অপরদিকে পরিচালক রাজকুমার হিরানী তার চিরাচরিত প্রথা অনুযায়ী আবারো প্রায় সাড়ে তিন বছরের জন্য বিরতি দেন সিনেমা নির্মাণে।

◾পরিচালক হিসেবে রাজকুমার হিরানী উত্থান হয়েছিল বলিউডের ব্যাড বয় নামে পরিচিত সঞ্জয় দত্তের সাথে কোলাবোরেশানে মুন্না ভাই এম.বি.বি.এস-সিনেমার মাধ্যমে। যে সিনেমা বদলে দিয়েছিল ধংশে দ্বারাপ্রান্তেন পৌছেযাওয়া সঞ্জয় দত্তের ক্যারিয়ার। যা এক কথায় সকল অডিয়েন্সই স্বীকার করবে। তবে আসল কথা হচ্ছে বলিউডের "ব্যাড বয়" কিংবা জেলে যাওযার পর "সঞ্জুবাবা" উপাধী সমুহ সঞ্জয় দত্তের নামে আগে এমনি এমনিই লাগেনি। বরং এসবের পিছনে রয়েছে এক অজনা ইতিহাস। যা বর্তমান প্রজন্মের বলিউড দর্শকদের একেবারেই অজানা ছিল। তবে সেসব কাহিনি বেশিদিন অজানা থাকতে হয়নি বর্তমান প্রজন্মের দর্শকদের। কারন দীর্ঘ প্রায় সাড়ে তিন বছর বিরতির পর ২০১৮ সালের ২৯ জুন পরিচালক রাজু হিরানী ফিরেন, তার ফিল্মি ক্যারিয়ারের প্রথম হিরো সঞ্জয দত্তের বায়োপিকের উপর নির্মিত সিনেমা সঞ্জু নিয়ে। যেটিতে অভিনয় করেছিলেন বলিউডের অন্যতম জনপ্রিয় অভিনেতা রনবীর কাপুর।

কেমন সিনেমা সঞ্জু~?

◾বলিউডের জনপ্রিয় অভিনেতা সুনীল দত্ত এবং অভিনেত্রী নার্গিস দত্ত দম্পতির একমাত্র সন্তান সঞ্জয় দত্তের জীবনী কোনো অংশে সিনেমা গল্পের চাইতে কম রোমাঞ্চকর নয়। বরং কিছু কিছু ক্ষেত্রে তার জীবনী সিনেমার গল্পকেও হার মানিয়েছে। কি নেই তার জীবনে! আছে মা নার্গিস দত্তকে হারিয়ে বন্ধুর পাল্লাই পড়ে মাদকে৷ নেশায় বুদ হওয়ার মতো ঘটনা। আছে আন্ডারওয়ার্ল্ড ডন দাউদ ইব্রাহিমের কাছ থেকে একে ৪৭-এর মতো ভয়ানক অটোমেটিক মারনাস্ত্র দিয়ে শুরু করে যুদ্ধে ব্যাবহৃত গ্রেনেড সংগ্রহের মতো ঘটনা! অতপর মুম্বাই পুলিশ কতৃক গ্রেপ্তার হওয়া, পুলিশ স্টেশনে চড় থাপ্পড় শিকার হওযা। এবং সর্বশেষে আদালত কতৃক দীর্ঘ সময়ের জন্য কারাবাস! কি নেই সঞ্জুবাবা জীবনে? হ্যা সঞ্জয় দত্তের এসব আলোচিত সমালোচিত রঙ বেরঙের দিনলিপিগুলো নিয়ে ২০১৮ সালে পরিচালক রাজকুমার হিরানী নির্মাণ করে৷ তার সর্বশেষ সিনেমা সঞ্জু। যেটিতে রাজু হিরানী তার অনবদ্য নির্মাণশৈলির মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলেছে এক সময়কার জনপ্রিয় এবং জনত্রিক্ত অভিনেতা সঞ্জয় দত্তের নানা রঙের দিনগুলি। যেটি মুক্তি লাভ করে ২০১৮ সালের ২৬ জুন। অতপর মুক্তি লাভের পর সঞ্জয় দত্তের সাথে নির্মিত প্রথম সিনেমা মুন্না ভাই এম.বি.বি.এস. যেমন কাঁপিয়ে ছিল বক্স অফিস। ঠিক তদ্রুপ ভাবে সঞ্জয় দত্তের জীবনীর উপর নির্মিত সঞ্জু সিনেমাটিও ঝড় তুলে বক্সঅফিসে। এবং আয় করে নেয় ৫৮০ কোটি রুপির মতো। যার সুবাদে অভেনেতা রনবীর কাপুর রাতারাতি মালিক হয়েযান ব্লকবাস্টার সিনেমার। অন্যদিকে পরিচালক রাজকুমার হিরানী আবারো দীর্ঘ সময়ের জন্য গায়েব হয়েযান!

📌এখন সময় ২০২২ সাল। অতপর তার চিরাচরিত প্রথা অনুযায়ী রাজা আবারো দীর্ঘ পাঁচ বছর পর ফিরছেন, বলিউড বাদশা শাহরুখ খানকে সাথে করে DUNKI-নামক নতুন সিনেমা নিয়ে। রাজু হিরানী এমন একজন পরিচালক যে আজ পর্যন্ত কখনো ফ্লপ তথা ব্যার্থতার মুখ দেখেনি। সেই মুন্নাভাই এম.বি.বি.এস. থেকে শুরু করে সঞ্জু পর্যন্ত প্রতিটি সিনেমায় হয়তো হিট, নয়তো ব্লকবাস্টার তকমা পেয়েছে। এখন আবার ২০২২ সালে দীর্ঘ পাঁচ বছর পর ফিরছেন, তার চেয়েও বড় কথা এবার আসছেন বলিউডের বাদশাকে সাথে নিয়ে! সুতরাং দেখার বিষয় এবার কোন রেকর্ড জোয়ার সাথে নিয়ে বক্সঅফিস ত্যাগ করেন বলিউডের অন্যতম শ্রেষ্ঠ পরিচালক রাজা, রাজু বা পরিপূর্ণ নামে যাকে সবাই রাজকুমার হিরানী বলে জানে।

Dunki Movie Review in Bangla


ডাংকি 

ডাংকি শব্দটির সাথে আমার প্রথম পরিচয় ২০০৪ সালে। না, বাংলাদেশে না, শব্দটি বাংলাদেশে প্রচলিত নয়। শব্দটি আমি শুনেছি প্রবাসীদের মুখে, স্পেসিফিক্যালি ইউরোপীয় প্রবাসীদের কাছ থেকে। আমেরিকা, কানাডা কিংবা অস্ট্রেলিয়ান প্রবাসীরা এই শব্দ জানে বলে আমার মনে হয় না, যদিও আমি সেসব মহাদেশে যাইনি। তবে ইউরোপে থাকার ক্ষুদ্র অভিজ্ঞতায় আজকে 'ডাংকি' নিয়ে কিছু কথা বলব।

প্রসঙ্গত, শাহরুখ-হিরানী জুটির আপকামিং প্রজেক্ট DUNKI ! তাদের ঘোষনার যে ছোট্ট ক্লিপটি দেখে ফ্যানরা শিহরণ অনুভব করছেন, আমিও আপনাদের দলেরই একজন। তবে সেই ছোট্ট ক্লিপের শেষে ধু ধু প্রান্তরের বুক চিড়ে এক ছোট্ট কাফেলার মাথার উপর দিয়ে বিমান চলে যেতে যেতে পদতলে যখন DUNKI লেখাটি ভেসে উঠল, আমার শরীরে গুজবাম্পস হলো! আমি নস্টালজিক হয়ে ফিরে গেলাম ১৮ বছর আগে! 

কী এই ডাংকি? এটা জানলে হবে না শুধু, অনুভব করতে হবে। এজন্য আপনার সামান্য ভুগোল জানা আবশ্যক! বাংলাদেশ থেকে ভারত, ভারত থেকে পাকিস্তান, পাকিস্থান থেকে আফগানিস্তান, আফগানিস্তান থেকে ইরান, ইরান থেকে তুরস্ক... বাংলাদেশ থেকে ক্রমাগত পশ্চিমে যদি যেতে থাকেন তাহলে ক্রমান্বয়ে এই দেশগুলো পড়বে। যদি কল্পনায় এই সাড়ে পাঁচ হাজার মাইলের বিশালতা আপনি অনুভব করতে না পারেন, ঝটপট গুগল ম্যাপটা একবার দেখে আসুন। অবশ্যই খেয়াল করে আসবেন, তুরস্কের ঠিক পরেই ইউরোপ ( গ্রীসের সীমানা শুরু) ! আহ! 'আমাদের' স্বপ্নের ইউরোপ! কত সাধের! কত আকাঙ্ক্ষার ! 

২০০৪ সালে অলিম্পিক আয়োজন হয়েছিল অলিম্পিকের জন্মভূমি গ্রীসেই! সে অলিম্পিকের মোটোও (motto) ছিল - ওয়েলকাম হোম! অলিম্পিকের প্রতি আমার কোনো ফ্যাসিনেশন ছিল না, আমি সম্পূর্ণ ভিন্ন উদ্দেশ্যে ঢাকা থেকে সিঙ্গাপুর এয়ারলাইনসের একটি বিমানে গ্রীস পাড়ি জমিয়েছিলাম অলিম্পিক শুরু হবার কয়েকমাস আগেই। (এয়ারলাইনসের নামটা উল্লেখ করার একটি বিশেষ কারন আছে, মনে রাখবেন)


প্রবাসে মূল শহরগুলোতে বাংলাদেশীদের একটি প্রাইম জোন থাকে। সেখানেই ৮০% বাংলাদেশী দোকান পাট রেস্তোরাঁ থাকে এবং গন-জমায়েত হয়। রাজধানী এথেন্সের এমন একটি জায়গা হলো - ওমোনিয়া (Omonia) এবং প্রথমবারের মত দেশী ভাইদের মিলনমেলা দেখতে একদিন সেখানে যাই।সেখানে অবস্থিত বাংলাদেশী রেস্টুরেন্ট Bengal Garden -এ বসে দেশীয় খাবার খাচ্ছিলাম, বেশ জনাকীর্ণ রেস্তোরাঁ। কয়েকজন আমাকে জিজ্ঞেস করল আমি নতুন এসেছি নাকি? আমি খেতে খেতে হ্যাঁ-সূচক মাথা নেড়ে জবাব দিচ্ছিলাম।তারা আমার পোষাক এবং অপরিচিত মুখ দেখে সহজেই আন্দাজ করতে পেরেছিল আমি নিউকামার। এই প্রশ্নকারীদের একজনকেই পাশের টেবিল থেকে বলতে শুনলাম- "সরকার লিগাল দিবো, পত্যেকদিন 'ডাংকি' আইতাছে, এই জন্য এত বাংগালী" ! এবং সেই মাহেন্দ্রক্ষণে আমি সর্বপ্রথম পরিচিত হই নতুন শব্দ 'ডাংকি'র সাথে !

শুনতে বেশ মজার এই শব্দটির আড়ালে বাস্তবতা কতটা নির্মম-নিষ্ঠুর জানেন? ক্ষুধায় দিনের পর দিন মাইলের পর মাইল হাঁটা! এক পোষাকে মাসের পর মাস থেকে গায়ে চর্মরোগে ঘা হয়ে ইনফেকশন হয়ে যাওয়া! বরফের রাস্তায় সপ্তাহের পর সপ্তাহ হেটে ফ্রস্টবাইটে পায়ের আঙ্গুল পচে যাওয়া! ক্লান্ত/অসুস্থ হয়ে পড়া একজন জীবন্ত মানুষকে পাহাড় থেকে ফেলে হত্যা করা! ফলের বাগানে লুকিয়ে রাত কাটানো অথচ একটিও ফল খেতে না পারা! পকেটের শুকনো মুড়ি আর বিস্কুট অনেক আগেই শেষ, কিছু অখাদ্য পাতা কাঁচা চিবিয়ে খাওয়া! সাঁতার জান না? বাতাস ভর্তি পলিথিন ফুলিয়ে তা আঁকড়ে ধরে নদী/খাল পার হওয়া, এতকিছুর পরেও নির্বিকার বিধি নিস্তার দেয় না! সমকামী কারো কাছে ধর্ষিত হওয়া এখনও বাকি! মা-বাবার আদরের দুলাল তখনো তা জানেই না! একটা ডাংকিতে আপনাকে এর সবকিছুর মধ্য দিয়েই যেতে হবে, কিন্তু মর্মান্তিক ব্যাপার হলো ডাংকির আগে এসবের কিছুই আপনি ঘুনাক্ষরেও টের পাবেন না !

এতক্ষণে সবাই আন্দাজ করে ফেলেছেন কী প্রসঙ্গে কথা বলছি আমি! হ্যাঁ, অবৈধ অভিবাসন প্রত্যাশী যারা বিভিন্ন দেশের গেমে (আমাদের দেশে এই অবৈধ অভিবাসন যাত্রা 'গেম' হিসেবে প্রচলিত) যাত্রা করেন, তাদের এই পুরো গেম যাত্রায় যে কটি আন্তর্জাতিক বর্ডার হেঁটে পাড়ি দিতে হয়, সেই বর্ডার পাড়ি দেয়াই হলো ডাংকি ! 

লেখার শুরুতে আপনাদের যে ভূগোল পড়িয়েছি, বাংলাদেশ থেকে অনেক আগেই এই সাড়ে পাঁচ হাজার মাইলের পথে অসংখ্য বেকার যুবক বহু আগে পাড়ি জমিয়ে ইউরোপ যাত্রা শুরু করেছিল।তাদের অনেকেই বর্তমান ইউরোপে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশী প্রবাসীদের প্রথম সারির।তাদের পুরো যাত্রাটি মোটামুটি এরকম ছিল- তারা বাংলাদেশ পাড়ি দিয়ে প্রথমে কিছুদিন ভারতে অবস্থান করে, তারপর ভারত থেকে পাকিস্তান চলে যায়। সেখানে টুকটাক কাজকর্ম করে টাকা জমিয়ে আফগানিস্তানকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি ইরানে চলে যায়। উল্লেখ্য পাকিস্থানে অবস্থানকালে তারা সেলাই/দর্জি কাজ শিখে, এবং সেই কাজ করেই টাকা জমিয়ে ইরানে চলে আসে কারন ইরানে ছোট ছোট গার্মেন্টস টাইপ ফ্যাক্টরিটতে দর্জি কাজ পাওয়া যেত। এরপর ইরানে কয়েকবছর কাজ করে টাকা কামিয়ে সুযোগমতো বর্ডার পাড়ি দিয়ে তারা তুরস্কে চলে যেত। এরপরই চলতো ডাংকিতে চড়ে বসা! এখানে একটা ব্যাপার লক্ষনীয়- ইন্ডিয়া/পাকিস্থান/ইরান/তুরস্কের বর্ডার পাড়ি দেয়াকে 'ডাংকি' হিসেবে অভিহিত করা হতো না, কেউ করে না সাধারণত। সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ তুর্কি-গ্রীস বর্ডার (এশিয়া-ইউরোপ বর্ডার) পাড়ি দেয়াকেই 'ডাংকি' ডাকা হয়! বাংলাদেশীদের ভাষায় 'ডাংকি মারা'! 

  তাদের এই দীর্ঘ যাত্রার গল্প অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে? আমারও মনে হয়েছিল প্রথমবার যখন সরাসরি এমন একজনের মুখেই ইতিহাসটা শুনি, যিনি নিজে ঢাকা শহরে প্রথম এসেছিলেন এথেন্স এয়ারপোর্ট থেকে শাহজালাল বিমানবন্দরে! বাংলাদেশ ছাড়ার প্রায় ১৩/১৪ বছর পর! 

কালের বিবর্তনে এই দীর্ঘ পথ ছোট হয়েছে, বিগত এক দশকের কিছু বেশি সময় ধরে সরাসরি তুরস্কের ভিসা নিয়ে বাংলাদেশীরা সেখানে চলে যায়। সেখান থেকে সোজা ডাংকিতে চড়ে বসে! সেই ১৮ বছর আগে আমি সেখানে দেখেছি সাইপ্রাসে হোটেল ম্যানেজমেন্ট পড়তে যাওয়া বাংলাদেশ সহ বিভিন্ন দেশের ছাত্ররা ডাংকি মেরে গ্রীস চলে এসেছিল। যেহেতু দক্ষিন-পূর্ব এশিয়া থেকে গ্রীসই প্রথম দেশ তাই সবাই এই ঐতিহাসিক দেশটি মাড়িয়েই পরবর্তীতে ইতালি,

স্পেন, সুইডেন, ফ্রান্স সহ নানা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

এবার আসুন আমরা তুরস্ক থেকে একটা কাল্পনিক ডাংকিতে চড়ে বসি! -
বাড়ী থেকে মায়ের/বোনের/স্ত্রীর সযত্নে গুছিয়ে দেয়া ব্যাগটি ফেলে রেখে একটা প্যান্ট, একজোড়া জুতা, একটা শীতের পোষাক/জ্যাকেট এবং পকেট গুজে নেয়ার মত শুকনো খাবার -এর বেশী একটা তোয়ালেও আপনাকে নিতে দেয়া হবে না! বুনো জংলি জানোয়ার টাইপ ৩/৪ জনের একটি দল এসে আপনাকে এভাবে রেডি হতে বলবে (liam Neeson এর Taken মুভি সিরিজে এরকম হিংস্র হিউম্যান ট্রাফিকার পোর্ট্রে করা হয়েছে)। তাদের প্রথম কথাই হবে- শুধু শুনতে এবং করতে হবে, কোন প্রশ্ন নয়।পালটা প্রশ্ন করলেই একজনকে এমন মারা হবে, সে মার দেখে বাকি সবাই পুরো ডাংকিতে বোবা হয়ে থাকবে!

ওহ! ভাল কথা- বাংলাদেশের দালাল আপনার দেয়া টাকার ভাগ তুরস্কের এই দালাল চক্রকে ঠিক মত পরিশোধ করেছে তো? না করলে আপনাকে কিন্তু দেশ থেকে আবার টাকা এনে এই বুনো জানোয়ারের দলকে দিতে হবে! দেশে আর টাকার জোগান নেই অথবা আপনি টাকা দিয়েছেন অমুকের কাছে এসব কথা শোনার সময় নাই কারোর! টাকা লাগবেই ! টাকা নেই, আপনি ডাংকিতে যাবেন না, তা-ও হবে না! সবাইকে একটা রুমে নিয়ে আসা হবে এবং টাকা দিতে অপারগ দলের একজনকে সবার সামনে দু'জন জানোয়ার শক্ত করে ধরবে আর তৃতীয় এক জানোয়ার এসে একটা গরম ইস্ত্রি পিঠে চেপে ধরবে! এই দৃশ্য দেখার পর কাউকেই আর টাকার কথা দ্বিতীয়বার বলার প্রয়োজন পড়ে না, পিঠে পোড়া ঘাঁয়ের ছেলেটিও টাকা দেয়! তার জন্য বাড়তি কোনো সমবেদনা আশা করেছিলেন কি কেউ?

টাকা পরিশোধ ধরে নিয়ে আমরা আবার ডাংকিতে ফিরে যাব লেখার ২য় পর্বে...

ডাংকি মুভি রিভিউ


ডাংকি (২য় পর্ব)

পোষ্টারে রাজকুমার হিরানির ডাংকি দেখে কেউ বিভ্রান্ত হবেন না, এটা ফিল্মের ডাংকি নয়, আমার ডাংকি! এবং আমার ডাংকির ২য় পর্বে আপনাকে স্বাগতম। 

শুরুতেই একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে গেঁথে নিন, আমি যে ডাংকির প্রেক্ষাপট আপনাদের দেখাব, সেটি কিন্তু গুগল ফেইসবুকের আগের যুগের! অথবা শুরুর যুগের। যদিও সেটি একই ধারায় চলমান বহুবছরের একটি প্রক্রিয়া যা সময়ের পরিক্রমায় ধীরে ধীরে পরিবর্তিত। তবে ইদানীং গুগলে ইলিগ্যাল মাইগ্র‍্যান্ট লিখে সার্চ দিলে ব্যাগ কাঁধে যাদের দেখতে পান, এরা কিন্তু শতভাগ সেই ধারার ডাংকির মাইগ্র‍্যান্ট নয়। ইলিগ্যাল মাইগ্র‍্যান্টদের কাঙ্ক্ষিত বর্ডারের বেশীরভাগ এখন দেয়াল তুলে সিল্ড করা হয়েছে। তাই বাক্স-পেটরা নিয়ে বর্ডারের কাছাকাছি গিয়ে বর্ডার খুলে দেবার দাবিতে বিক্ষোভরত ইদানীংকালের মাইগ্র‍্যান্টদের শতভাগ ডাংকি ভেবে ভুল করবেন না। 

 বর্ডার ক্রসিংয়ে ডাংকির দুটো ধরন রয়েছে। ধরন না বলে ক্লাস বলাই বোধহয় যুক্তিসঙ্গত শোনাবে। বিমানে যেমন ফার্স্টক্লাস এবং ইকোনমি ক্লাস, অনেকটা তেমন। ফার্স্টক্লাস ডাংকিতে আপনি বড় বড় পণ্যবাহী কাভার্ড ভ্যানে বিশেষভাবে তৈরি করা কফিন চেম্বারে শুয়ে থাকবেন! কফিন চেম্বার এজন্যেই বললাম অনেকটা কফিনের সমান বক্সেই আপনাকে শুইয়ে দেয়া হবে। আপনি এভারেজের চেয়ে বেশী মোটা কিংবা বেশি লম্বা হলে সেখানে কিভাবে ফিট হবেন সেটা আপনার ব্যাপার! যদি আপনার ক্লস্ট্রোফোবিয়া (Claustrophobia)
না থাকে তাহলে দুশ্চিন্তা করবেন না, একটা সিলিন্ডার থেকে পাইপের মাধ্যমে সবকটি কফিন চেম্বারে অক্সিজেনও সরবরাহ করা হবে। যাত্রাকালও সংক্ষিপ্ত, অনেকটা ঢাকা থেকে কক্সবাজার যাবার মত, এক রাত বা এক বেলার ১০/১২ ঘন্টা জার্নি বা ক্ষেত্র বিশেষে তারও কিছু বেশী। কফিন চেম্বার ছাড়া যত অ্যাভেইল্যাবল রিলাক্স মুডে আপনি এই পণ্যবাহী গাড়ীর ডাংকি হবেন, ধরা পড়ে যাবার সম্ভাবনা ততই ব্যস্তানুপাতিক হারে বেড়ে যাবে!

এই ফার্স্টক্লাস ডাংকির খরচ বেশি। দালালের সাথে চুক্তিতে দেশ থেকে যাওয়া ছেলেরা এই ডাংকিতে চড়তে পারে না। কারন দালাল যত কম খরচে আপনাকে অন্য দালালের হাতে তুলে দেবে, তার তত লাভ! স্বাধীন এবং স্বচ্ছল মাইগ্র‍্যান্টরাই কেবল এই প্রথম শ্রেনীর যাত্রী। তবে সমস্যা হলো- ইদানীংকালে বাংলাদেশের পুলিশ যেভাবে ট্রাক-বাসের গোপন চেম্বার থেকে ইয়াবার চালান বের করে ফেলে, ইউরোপের বর্ডার পেট্রোল বাহিনীও একইভাবে কফিন চেম্বার খুঁজে ইমিগ্র‍্যান্ট বের করে ফেলে! ফলাফল- আপনি যেখান থেকে এসেছেন, সেখানে ফেরত। এরপর আবার সেকেন্ড, থার্ড, ফোর্থ এটেম্পট, এভাবে চলতে থাকে। কেউ কেউ ১০-১৫ বারে সফল হয়, অনেকে কখনই সফল হয় না। অনেকে আবার নির্দিষ্ট নিরাপদ গন্তব্যে পৌচ্ছাতে দেরী হবার কারনে অক্সিজেন ফুরিয়ে যাওয়ায় কফিন চেম্বারেই করুণ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন! যদিও ড্রাইভার জানে কখন আপনাদের অক্সিজেন শেষ, আপনারা মারা যাচ্ছেন! তবুও ধরা পড়ে জেল জরিমানার ভয়ে যেখানে সেখানে বক্স খুলে আপনাকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো তাগিদ উনি অনুভব করবেন না! এখানে বলে রাখা ভাল- ইউরোপ তথা পশ্চিমা দেশগুলোতে হিউম্যান ট্র‍্যাফিকিং, ড্রাগস ট্র‍্যাফিকিং এবং আর্মস ট্র‍্যাফিকিং তিনটিই সমমাত্রার প্রথম শ্রেনীর গুরুতর অপরাধ! ধরা পড়লে জামিন নাই !

এহেন অখ্যাত মৃত্যু সংবাদগুলো খুব একটা সংবাদমাধ্যমে আসে না বা শতভাগ আসে না। কারন জাতিসংঘ জীবিত মানুষ নিয়ে ততটা সোচ্চার না, যতটা সোচ্চার তারা মৃত মানুষ নিয়ে। যে দেশের সীমানার ভেতর মৃত্যু হয়, সে দেশের উপর বেশ চাপ আসে উপর মহল ( জাতিসংঘ এবং বিভিন্ন মোড়ল রাষ্ট্র ) থেকে। মরার পরে তাদের মনে প্রশ্নের উদয় হয় কেন মরল? কেন আশ্রয় দিয়ে তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হলো না? 

তাই গোপনে লাশ দাফন করে দালালচক্রও বেঁচে যায় খুনের দায়ভার থেকে, দেশও বেঁচে যায় জবাবদিহিতার দায়ভার থেকে! মরে যায় শুধু মানুষটা! কারো প্রিয় মানুষটা, কারো পরিবারের একমাত্র অবলম্বনটা, কারো অতি আদরের সন্তানটা, প্রেমিকাকে 'একদিন স্বাবলম্বী হয়ে ফিরে আসব' কথা দিয়ে আসা বেইমান প্রেমিকটা! যার প্রেমিকা সারাজীবন জানবে বেইমানটা বিদেশ গিয়ে নিজের পরিবারকেই মনে রাখেনি, আমাকে কীভাবে মনে রাখবে!

কষ্ট পাচ্ছেন? এখনি? ইকোনোমি ক্লাসের ডাংকির গল্প তো এখনও বাকি! আর এই ইকোনোমি ক্লাসের ডাংকির প্রস্তুতি দিয়েই প্রথম পর্বের লেখা শেষ করেছিলাম। যে যাত্রার জন্য আপনাকে প্রস্তুত করা হয়েছে, ডাংকির এই রুট (route) স্থান ভেদে কয়েকশ কিলোমিটার পর্যন্ত পায়ে হাঁটা দুর্গম পথ! আর এজন্যই দেশ থেকে সুন্দর কালার পছন্দ করে কিনে আনা ফ্যাশনেবল ব্যাগখানি ফেলে দিয়ে, এক কাপড়ে, শুকনো খাবার পকেটে গুঁজে নিতে বলা হয়েছে! আপনার শরীরে কোনো বাড়তি ওজনের ঝামেলা তারা চায় না যা আপনাকে ক্লান্ত করে হাঁটার গতি কমিয়ে দিতে পারে! আপনি অবশ্য এসবের কিছুই জানেন না, আপনি জানেন ২ রাতের পায়ে হাঁটা পথ ! আজ এবং কাল এই দুই রাত হাঁটলেই পরশু ইউরোপ ! আহ! 'আমাদের' স্বপ্নের ইউরোপ! কত সাধের! কত আকাঙ্ক্ষার ইউরোপ! 

ডাংকির দালালদের 'ডংকার' ডাকা হয়। এই দীর্ঘ দুর্গম  পথ কয়েকটি ডংকার বাহিনী পর্যায়ক্রমে ডাংকির দলকে ক্রমশ বর্ডারের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। ডংকারদের প্রথম দলটি আপনাদের পুরো ডাংকির দলকে শহর পাড়ি দিয়ে অপেক্ষাকৃত নির্জন কোনো এক গ্রামে নিয়ে যাবে, নিতান্তই কম জনবসতিপূর্ণ। সেখানে পরিত্যক্ত শস্যাগার(barn) অথবা আস্তাবল(stables) জাতীয় একটি নোংরা অস্বাস্থ্যকর থাকার জায়গায় আপনাদের আশ্রয় মিলবে। সেখানে আপনি  দেখা পাবেন আপনাদের মত ছোট ছোট অনেক ডাংকির দল! আফগানি, সিরিয়ান, ইরাকী, ইন্ডিয়ান এবং পাকিস্থানী সহ বাংলাদেশী ডাংকির অন্য দলের। না, সেখানে পিকনিকের আমেজে ইউরোপ যাবার উন্মাদনায় ঘুরে বেড়ানো বা খোশগল্প করে সময় কাটবে এমন ভাবনা এখনি মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলুন এবং এখন থেকেই হিউম্যালিয়েশন, হারেসম্যান্ট এবং এমবারেসমেন্ট এসবের প্রস্তুতি নিন! চুপচাপ ঢুকে পড়ুন সেখানে, বসে থাকুন কোথাও ভেড়ার পালের মত চুপচাপ! ওয়েলকাম টু হেল বাডি.. বা নরকে আপনাকে স্বাগতম -এটা আপনাকে এখন বলাই যায়!

কিছু ডাংকির দল আগেই সেখানে চলে এসেছে, আপনারা এখন এসে পৌঁছেছেন, এবং বুঝতে পারছেন এখনো এসে পৌঁছানোর বাকি আরও বেশকিছু দলের। দিন পার হয়ে রাত হয়ে গেল, থেমে থেমে ডাংকির দল আসছেই। থাকার জায়গাটা ক্রমেই ঘনবসতিপূর্ন হয়ে যাচ্ছে, গাদাগাদি-ঠেলাঠেলি এখনই শুরু হয়ে গিয়েছে। শক্তি-সামর্থ, আকার-আকৃতি এবং হিংস্র মনোবৃত্তি এই তিন উপাদানের উপর নির্ভর করবে আপনি সেখানে কতটা কোনঠাসা হয়ে থাকবেন আর কতটা ডমিনেটেড থাকবেন। অন্যান্য যেসকল দেশের ডাংকি এখানে রয়েছে বলে উল্লেখ করেছি, তন্মধ্যে ভারতীয় এবং বাংলাদেশীরাই এই যোগ্যতায় সবার নীচে! আপনার অবশ্য অতটা খারাপ লাগছে না এই ভেবে- না হয় পাশের ইরাকী/সিরিয়ান দলটা একটু বেশিই জায়গা দখল করে আছে, কতক্ষনই বা আর? আর কিছুসময় পরেই তো বর্ডারের পথে রওনা হব। কিন্তু আপনি এটা জানেন না, পরবর্তী ডংকার (দালাল) সবুজ সংকেত না দেয়া পর্যন্ত আপনাকে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য এখানেই পড়ে থাকতে হবে! ভাল কথা, ক্ষুধা লেগেছে? পকেটে হাত দিন!

এখন আমি আপনাদের এমন এক কাহিনী শোনাব, যে কাহিনী আপনি হয়তো রয়টার/এপি/বিবিসি.. কাউকেই বলতে শোনেননি! এই কথা আসলে কাউকে বলাও যায় না! তাই হয়ত সংবাদের আড়ালে থেকে গিয়েছে। আর এসবের দৌড়াত্ম্য সম্পর্কে তখন সমাজ আরো কম খোলামেলা ছিল! বলছি সমকামিতা নিয়ে, আরো স্পষ্ট করে বললে- অসহায়ত্বের সুযোগে সমকামিতা! 

যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশের শরণার্থী শিবিরে (নিকট অতীতে সিরিয়ান শরণার্থী শিবিরের ঘটনা জেনে থাকবেন হয়তো) অসহায় যুবতী কিশোরীরা যেমন একদল নরপশুদের চোখে পড়ে যায়, ঠিক তেমনি কার্যত অসহায় ডাংকিদের ক্যাম্পে এরকম কিছু নরপশুদের আনাগোনা হয়। যদি এই নরপশুর তালিকায় ডংকার দলের কেউ নিজেই থাকেন, নিজের উদ্দেশ্য চরিতার্থ করে ফেলেন ডেকে নিয়ে গিয়ে। আর যদি নরপশু বাইরের কেউ হন, তাহলে ডংকার টাকার বিনিময়ে বিকিয়ে দেন কাউকে কিছু সময়ের জন্য! সাধারণত ছোটখাট (short heighted), দেখতে ভাল এবং কম প্রতিরোধ করতে পারবে এমন ছেলেরাই এই নরপশুদের প্রধান ভিকটিম। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, কেউ না জানলে এই ঘটনা আমি জানি কি করে? (প্রথম পর্বে ধারনা পেয়ে একজন আমাকে কমেন্টে প্রশ্নও করেছেন) 

উত্তর- এই পথে পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছানো বেশিরভাগ মানুষ শতভাগ আহামরি সাকসেসফুল কিছু হয় না। স্থানীয় গার্মেন্টসে কাপড় সেলাই এবং রেস্টুরেন্টে ক্লিনার হয় ৬০ভাগ প্রবাসী। ১৫ ভাগ রাস্তায় হেঁটে ফুল বিক্রি করে, ১০ ভাগ অবৈধভাবে ফুটপাথে কম দামে চায়নিজ অন্তর্বাস এবং কাপড় বিক্রি করে (যার প্রধান ক্রেতা বুলগেরিয়া/রোমানিয়া/জর্জিয়া/মলদোভা/ইউক্রেন ইত্যাদি দেশগুলোর কর্মজীবী ইমিগ্র‍্যান্ট নারীরা), ৫ ভাগ কনস্ট্রাকশন লেবার/রং মিস্ত্রি, ৫ ভাগ ট্রাফিক সিগনালে গাড়ির উইনশিল্ড মোছে, আর বাকি ৫ ভাগ দুলাভাইয়ের মুদি দোকানে সেলসম্যান/ চাচার হোটেলে ওয়েটার-ক্যাশিয়ার/ মামার সস্তা মোবাইলের দোকানের আড়ালে হুন্ডি ব্যবসার টাকা রিসিভ করে।বাড়তি ইনকাম হিসেবে চাকরিতে ওভারটাইম, এবং ফুল-ফুটপাথ ব্যবসায়ীদের বাড়তি ইনকাম আসে বৃষ্টির দিনে পাতাল রেলের প্রবেশমুখে ২ ইউরোর চায়নিজ ছাতা ৫ ইউরোতে বিক্রি করে এবং সামারে (summer) সমুদ্রতীরে সানবাথের চাইনিজ চাটাই এবং সান হ্যাট বিক্রি করে। 

কিছু মানুষ সেখানে অল্পদিনের মেহমান হিসেবে বিমানে চেপে যায়- ছাত্র/ব্যবসায়ী/ভ্রমনকারী হিসেবে। তারমধ্যে ছাত্ররাই সবচাইতে দীর্ঘ সময়ের মেহমান। এই ছাত্রদের অভিবাসী মানুষগুলো অনেক সন্মান করে, বাবা/চাচার বয়েসি লোক সিগারেট বাড়িয়ে দিতে দ্বিধাবোধ করে না। একদিন দাওয়াত করে খাওয়াতে কখনই টাকার হিসেব করে না। দেশে ফোন করে বাবা/মা/বউ কে যা না বলবে, আপনি তার চে ঢের বেশি জানবেন। যতক্ষন তার সাথে থাকবেন ততক্ষণ জানবেন দেশে তার কাছে কে কি চেয়েছে? বাবা ২ বিঘা জমি বায়না করে ফেলেছে, বাকি টাকা তার দেয়াই লাগবে! বউ কার গয়না এক-আধ ভরি বেশী হয়ে গেল সেই হিসেবে নতুন গয়নার বায়না ধরেছে, ভাগিনা মোবাইল চেয়েছে দামি মোবাইল, বন্ধু বিদেশ নিয়ে আসতে বলেছে যে করেই হোক!.. আর মা? মা দের কখনো কিছু চাইতে শুনিনি, তারা শুধু কমন কিছু কথাই সারা বছর বলেন- ভাত খাইছ বাবা? কবে আসবা? আগের চেয়ে শুকিয়েছ কি না? শীত বেশী ? ঠান্ডা লাগিও না... 

 বাংলাদেশে পরিবারের ক্রমাগত প্রয়োজন মেটানো টাকার মেশিন, মাত্র ৫০০-৭০০ ইউরো কামানো এই মানুষটা মাঝে মাঝে মানসিক চাপ সহ্য করতে না পেরে ২ টা বিয়ারের ক্যান কিংবা ২ পেগ মদ খেয়ে মগজ কে শান্তি দেবার ব্যর্থ চেষ্টা করে, মাঝে মাঝে তার কথায় বের হয়ে আসে তার কষ্টের অতীত! কান্নাজড়িত কন্ঠে আবেগতাড়িত হয়ে অনেক কিছুই বলে ফেলেন ! সে কষ্টের কথা শোনার পর অনেকেই তা চেপে রাখেন, সব কথা কি আর বলে বেড়ানোর মত!

ডাংকি মুভি রিভিউ
(image credit: jio studio)


মনে আছে তো কোথায় ছিলেন? ডাংকির পরবর্তী পয়েন্ট থেকে সবুজ সংকেতের অপেক্ষায় আছেন আপনি.. কথা দিলাম, ৩য় পর্বে অবশ্যই আপনার ডাংকি আমি ইউরোপে পৌঁছে দেব...


ডাংকি (৩য় পর্ব- উপসংহার)


  শেষবারের মত আমার ডাংকিতে আপনাদের সবাইকে স্বাগতম। সুখ-দু:খের পাশাপাশি কাহিনীতে একটু কমেডি না থাকলে কেমন দেখায় বলেন! প্রথম পর্বে আপনাদের আমাকে বয়ে নিয়ে যাওয়া এয়ারলাইন্সের নাম মনে রাখতে বলেছিলাম, এই বিমানটি প্রথমে ঢাকা থেকে সিঙ্গাপুর এবং এগার ঘন্টা পর সিঙ্গাপুর থেকে সোজা গ্রীসের রাজধানী এথেন্স রওনা করে। 

সেই প্রথম দিকে বাংলাদেশী অধ্যুষিত এলাকার পার্শ্ববর্তী এক পার্কের বেঞ্চিতে বসে আছি। আশেপাশে বাঙালী, আফ্রিকান সহ অনেক রকমের মানুষের আনাগোনা। এরমধ্যে দুই দেশিভাই আমাকে দেখে কাছে এলেন, আমি হাসিমুখ করে তাদের দিকে তাকালাম। 
দেশিভাই ১: ভাই কি নতুন?
আমি: হ্যাঁ ভাই।
দেশিভাই ২: অপেক্ষাকৃত কম বয়সী, নির্বিকার, আগ্রহ নিয়ে আমাকে পর্যবেক্ষণরত.. 
দেশিভাই ১: দেশের বাড়ি কই? 
আমি: ঢাকায়।
দেশিভাই ২: নির্বিকার, আগ্রহ নিয়ে আমাকে আরও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণরত। সম্ভবত দেখতে আমি তার চে স্মার্ট, এটা তার সহ্য হচ্ছিল না।
দেশিভাই ১: তুর্কি দিয়া ঢুকছেন নাকি সাইপেরাস (সাইপ্রাস) দিয়া?
দেশিভাই ২: যথারীতি নির্বিকার এবং একই ভঙ্গিমায় পর্যবেক্ষণরত..
আমি: আমি সিঙ্গাপুর হয়ে আসছি ভাই।

আমার উত্তর শুনে দেশিভাই ১ আক্কেলগুড়ুম হয়ে দেশিভাই ২ এর দিকে তাকালেন। দেশিভাই ২ এবার সরব হলেন! "সিঙ্গাপুরের লগে লাইন আছে নি? আহেন" - বলে দেশিভাই ১ কে হাত ধরে টেনে নিয়ে যেতে যেতে আমাকে শুনিয়েই বলে গেলেন- "আরে ঢাকাইয়া পোলাপাইন চাপাবাজ"! ঘটনার আকস্মিকতায় আমিও আক্কেলগুড়ুম। 

বেশকিছুদিন পরে বুঝেছি কেন আমার উত্তর তাদের কাছে অবিশ্বাস্য লেগেছে! আশাকরি আগের দুই পর্ব পড়ে আপনারাও সেটা বুঝে ফেলেছেন এতক্ষণে!

 শাহরুখ-হিরানীর ডাংকি নিয়ে আমার মত কোটি কোটি ভক্ত অনুরাগী এক্সাইটেড। অনেকেই ইউটিউব/গুগলের কল্যানে ডাংকি শব্দের মর্মার্থ জেনে ফেলেছেন।বিভিন্ন মুভি রিলেটেড গ্রুপে রিভিউ লেখেন এমন অনেকেই সংক্ষেপে অবৈধ অভিবাসন বেইজড মুভি হতে চলেছে লিখে ফ্যানদের কিউরিয়াস মাইন্ড স্যাটিস্ফাইড করেছেন। তাহলে আমি একটা মুভি রিলেটেড গ্রুপে মোটামুটি একটা গল্প লিখতে কেন বসে পড়লাম? আমি গ্রুপটার কাছে ঋনী তারা আমাকে এখানে সাহিত্য চর্চা করার সুযোগ  দিয়েছে! তো কেন এই লম্বা সাহিত্য? কেন পাঠক টেনে ধরে রাখার মত ইন্টারেস্টিং করে একটি গল্প বলার চেষ্টা? বলতে পারেন-নাম ফুটানোর জন্য! সেক্ষেত্রে দু:খিত এটি আমার ছদ্দনাম/ছদ্দপ্রোফাইল। আইডিটা কাল হারিয়ে গেলে পরশু অন্য নামে থাকব আমি। যারা এই লেখা পড়ে আমার সাথে এড হয়েছেন, তারাও দেখেছেন আমার প্রোফাইল গড়ের মাঠ!

আমার এই গল্পের দুই পর্ব পড়ে প্রায় সকল সিনেমাখোর পাঠক মুগ্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন এবং একইসাথে তাদের আরেকটি প্রতিক্রিয়া ছিল হিরানী এরকম এলিমেন্ট পেলে একটা বিস্ফোরক মুভি বানাবে! আচ্ছা, কারো মাথায় কি একবারের জন্য এই চিন্তা এসেছে- যে আমাদের দেশের কেউ এমন স্টোরিলাইন পেলে একটা ধামাকা সিনেমা বানাতে পারবে? এই গল্পে তো বাংলাদেশের কথাই আছে, আমাদের ছেলে, আমাদের আবেগ, আমাদের বাস্তবতা ! একটা স্ট্রং সোশ্যাল মেসেজও আছে..! হিরানীর সিনেমার ডায়লগ দিয়েই যদি বলি- " কিসিকি দিমাগ মে ইয়ে সোচ আয়া? এনিওয়ান? ন্যাহি, সাব রেস মে লাগ গ্যায়ে -হিরানী কা ফিল্ম ক্যায়সা হোগা"

কারো মুখে একবারও শুনতে পেলাম না আমাদের দেশের একজন কীর্তিমান পরিচালকের নাম! যিনি এমন এলিমেন্ট ওরিয়েন্টেড স্টোরিলাইন পেলে ধামাকা করে ফেলতেন! তাহলে আমাদের দেশে কি এমন কোনো ফিল্ম মেকার নেই এরকম একটা মুভি পর্দায় তুলে আনার মত? স্বাভাবিকভাবেই উত্তর হবে- আছে হয়ত, তবে তিনি কোনো দর্শকের মগজ-মননে জায়গা দখল করতে ব্যর্থ, এটা পরিষ্কার ! 

কেউ কেউ অবশ্য স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পেরেছেন, প্রথম পর্ব পড়ে একজন লিখেছেন 'মনে হলো একটা মুভি শেষ করলাম' এবং দুই পর্ব পড়ে একজন লিখেছেন- 'একটা মুভি দেখার সমান আমেজ নিয়ে লেখাদুটো পড়েছি'। হয়ত.. এই তালিকায় আরও কেউ থেকে থাকবেন। এখন সবার কাছে প্রশ্ন- নিজের দেশের ইন্ডাস্ট্রিতে, নিজেদের গল্পে কেন আমরা এমন সিনেমা পেতে আশাবাদী নই? ভাবতে থাকুন আমি ততক্ষণে আবার ডাংকিতে ফিরে যাই..

..রাত গভীর হয়েছে, সামান্য আলোর ব্যবস্থা আছে ভেতরে কিন্তু তা এতই সামান্য যে তাতে কাছে পিঠের মানুষের অবয়ব বুঝতেই কষ্ট হচ্ছে আপনার। কথা বার্তায় শুধু ফিসফিসানি।এর সব যদিও আপনার ভালর জন্যই, কারন এখানে আপনাদের উপস্থিতি স্থানীয় প্রশাসন থেকে আড়াল করা, এলাকার প্রভাবশালী কাউকে টাকা দিয়ে আপনাদের এই ট্রানজিট পয়েন্টের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জায়গাটা এখন একেবারে গিজগিজে অবস্থা, এত এত ডাংকির দল আসবে সেটা অচিন্তনীয় ঠেকবে আপনার কাছে!বসে নড়াচড়া করাই কঠিন হয়ে যাচ্ছে, একটু উঠে দাঁড়াতে মন চাইছে? ভেবে চিন্তে দাঁড়াবেন, একবার উঠে দাঁড়ালে ফের বসার জন্য প্রয়োজনীয় জায়গাটুকু পেতে কষ্ট হয়ে যাবে কিন্তু!

আর কতক্ষণ? কখন মুক্তি পাব এই যন্ত্রনা থেকে? কখন রওয়ানা হব? -এসব চিন্তা ছাড়া অন্য কোনো চিন্তা আপনার মাথায় আসবেনা সে সময়, সাথের বা আশেপাশের কেউও জানে না এসবের উত্তর। ইচ্ছা করবে চিৎকার করে কাউকে জিজ্ঞেস করতে - 'আমরা কখন রওয়ানা হব'?? পরক্ষনেই ডংকারের জানোয়ার স্বভাবের কথা মনে করে নিজের মনকে শান্ত করবেন আপনি। অনেকটা বুকে হাত দিয়ে 'অল ইজ ওয়েল.. অল ইজ ওয়েল' বলার মত.. 

এখান থেকে মুক্তি পেয়ে শুধু যে পায়ে হাঁটা আর ক্ষুধার কষ্টই সর্বেসর্বা তা কিন্তু নয়! আপনার এই ভোগান্তি আবহাওয়া এবং জলবায়ুর দ্বারা বহুলাংশে প্রভাবিত। সময় ভেদে শীত-গ্রীষ্ম মিলিয়ে বছরে গড়ে ৬-২৫ ডিগ্রি সে. তাপমাত্রা বিরাজ করে এই অঞ্চলে। মাঝে মাঝে কম-বেশী তো হয়ই, তুষারপাতও হয় বছরে তিন/চার মাস! স্কুলের ভুগোল বই-তে ভুমধ্যসাগরীয় জলবায়ু পড়েছিলেন সবাই। মনে নেই নিশ্চই, আজকের পরে অবশ্য মনে থাকবে বাকি জীবন। সেখানে গ্রীষ্মকালে বৃষ্টি হয় না, হয় শীতকালে ! চিন্তা করতে পারছেন? কী ভোগান্তিতেই না পড়তে পারেন সামনের দিনগুলোতে ! দেশ থেকে গেমে চড়ার সময় এসব নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই গবেষণা করে আসেননি আপনি, আপনার কোমলমতি মন তাই অনাগত ভোগান্তিকে ভাগ্যের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে ফরিয়াদ করবে একসময়, শীঘ্রই!

তীব্র অস্বস্তি, সীমাহীন দুর্ভোগ আর ডংকারের দেয়া প্রতি বেলায় দুই স্লাইস করে শুকনো রুটি খেয়ে দুদিন পরে ভাগ্য কিছুটা সুপ্রসন্ন হলো। পরবর্তী পয়েন্ট থেকে সবুজ সংকেত এল, ডাংকির বিশাল দলটি কয়েকটি ছোট দলে ভাগ হয়ে রাতের আঁধারে ডংকার দলনেতার পিছু পিছু রওয়ানা হলো। আপনি এমনই কোনো এক দলের সওয়ারী। টহল পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে রাতের আঁধারে যথাসম্ভব নি:শব্দে পথচলা। 

বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আপনারা রাতে হাঁটবেন, দিনে ঘন কোন ঝোপঝাড়-জঙ্গলে লুকিয়ে বিশ্রাম নেবেন, কখনো দিনেও হাঁটবেন। সবই নির্ভর করবে বর্ডার পেট্রোল/স্থানীয় পুলিশ এবং চলার পথে কোনো লোকালয়ের মানুষজনের চোখ ফাঁকি দেয়ার উপর। অনেকসময় মানব পাচার হচ্ছে, এই চিন্তা থেকে নৈতিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে স্থানীয় লোকজন পুলিশে খবর দিয়ে দেয়! ফলাফল- ডংকার পলাতক এবং আপনি পাকড়াও!

এসকল সীমাবদ্ধতা যদি কিছুটা অনুকূলে থাকে তাহলে চলতি পথে দু'দল ডংকারের কাছে হাত বদল হয়ে আপনি ইউরোপের সীমানায় পৌঁছে যাবেন ৪/৫ দিনে। কিন্তু ভাগ্য প্রধানত এতটা সুপ্রসন্ন হয় না! কদাচিৎ ডাংকির দল এত দ্রুত বর্ডারে পৌঁছায়!

দ্বিতীয় বা তৃতীয় ধাপে আপনি যতই ক্রমশ অগ্রসর হবেন, এসকল সীমাবদ্ধতা ততই প্রকটতর রুপে দেখা দেবে! সেই যে যাত্রা শুরুর আগে যেমন আটকে ছিলেন, তেমনি বনে বাদাড়ে আটকা পড়ে থাকবেন। পকেটের জমানো খাবার শেষ হয়ে যাবে, ক্ষুধায় গাছের পাতা লতা কাঁচা খাবেন আপনি। মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দেবে বৃষ্টি কিংবা ক্ষেত্র বিশেষে তুষারপাত! ভিজবেন আর শুকাবেন, এভাবেই জেগে থাকবেন, হাঁটবেন অথবা ঘুমাবেন। খবরদার! চলতি পথে আহত হবেন না যেন! পথের চড়াই উতরাইতে কোনো ভাবেই যেন পা মচকে বা ভেঙ্গে না যায়। যদি এমন কিছু হয়, ধরে নিতে পারেন আপনার মৃত্যু নিশ্চিত ! বিশ্বাস হচ্ছে না? আচ্ছা সমীকরণটা আপনার হাতে তুলে দেই, আপনি ফলাফল বের করে বলেন দেখি! -
 
মচকানো বা ভাঙ্গা পা নিয়ে আপনি এই দলের সাথে তাল মিলিয়ে হাঁটতে পারবেন না, এক পয়েন্ট থেকে অন্য পয়েন্টে পৌঁছানোর টাইমিং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পুরো দলটির সফলতার জন্য। আপনার জন্য পুরো ডাংকির দল ফেসে যেতে পারে। তাহলে ডংকারের করনীয় কি? আপনাকে এই বনে বাদাড়ে ফেলে রেখে গেলে তো আপনি আশ্রয় খুঁজতে গিয়ে লোকালয়ে চলে যাবেন, তারা জেনে যাবে এই পথে ডাংকি যাচ্ছে এবং তারা পুলিশে কল করে দেবে। পুরো ডাংকির দলের জন্য আপনি এখন একটা হুমকি! তাহলে বলুন দেখি ফলাফল কি পেলেন হাতে? গায়ে কাঁটা দিচ্ছে? দেবারই কথা ! ডংকার পুরো দলটাকে একটা নির্দিষ্ট পথে এগিয়ে যেতে বলবে, আপনার পা যেহেতু ভাঙ্গা আপনাকে পেছনে ফেরত পাঠানোর একটা ব্যবস্থা করে আসছে- এই বলে আপনাকে নির্জনে নিয়ে আসবে কোথাও... ঘন্টা খানেক পরে সেই ডংকার পায়ে হাঁটা দলে এসে যোগ হবে, সাথে নেই সেই পা ভাঙ্গা ছেলেটা! শুনে থাকবেন হয়তো- ডাংকির পথে অনেকে হাড়-গোড় পড়ে থাকতে দেখেন!

এ যেন এক সীমাহীন পথচলা.. হাঁটছেন আর হাঁটছেন.. ক্ষুধা, ক্লান্তি, রোদ, বৃষ্টি, বরফ, ভেজা স্যাঁতসেঁতে জুতা, শরীরের দুর্গন্ধ সব ছাপিয়ে কেবল হাঁটা.. হঠাৎ খেয়াল করলেন একটা ফলের বাগানের পাশ দিয়ে যাচ্ছেন কিংবা কোনো ফলের ক্ষেত পেরিয়ে যাচ্ছেন! আহ! তীব্র ক্ষুধায় এ যেন অমৃতের সন্ধান লাভের মত.. কিন্তু না, একটি ফলও খাওয়া হবে না আপনার! বলেন দেখি কেন? ঠিক ধরেছেন কাল সকালে বাগান/ক্ষেতের মালিক এসে টের পেয়ে যাবে কে বা কারা তার ফল খেয়ে সাবার করে গিয়েছে! তার মানে এই পথে ডাংকি গিয়েছে.. নগদ পুলিশে ফোন! না এবার নৈতিকতার খাতিরে নয়, তিনি ফোন করবেন তার ফল খাওয়ার প্রতিশোধ নিতে...

ভাগ্যিস খাল বিল সাঁতরাতে আমাদের ছেলেদের তেমন কোন সমস্যা হয় না, নদীমাতৃক দেশের সন্তান আমরা। তবে সাইপ্রাস পড়তে যাওয়া ঢাকার ছেলেপুলে যখন ডাংকিতে খাল পারাপারের সম্মুখীন হয়, তখন সেটা জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণই বটে! ডংকারের এগিয়ে দেয়া বাতাসভর্তি পলিব্যাগ একমাত্র ভরসা তার জীবন এবং মৃত্যুর পার্থক্যের জন্য!

এরকম আরও অনেক অনেক অনেক সীমাবদ্ধতা এবং প্রতিবন্ধকতাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে চলছে আপনার ডাংকি, আপনার স্বপ্ন, আপনার ইউরোপ যাত্রা... চলছে না শুধু পা টা আর! আর যেন চলছেই না... অবশেষে একদিন শেষ ধাপের ডংকার বলে উঠলেন- 'এই সোজা পথে চলে যাও.. ওই যে ২/৩ মাইল দুরে হালকা আলোর আভা দেখতে পাচ্ছ সেটা আর্মি ক্যাম্প, ওটাই বর্ডার, গিয়ে সারেন্ডার কর'।এই বলে ডংকার আপনাদের ছেড়ে সেখান থেকে চলে যাবে। অবশেষে আপনি শেষপথটুকু মাড়িয়ে আর্মির কাছে ধরা দেবেন। তারা আপনাকে নিয়ে যাবে রিফিউজি ক্যাম্প নামক এক স্থানে, সেখানে মিলবে প্রয়োজনীয় খাবার, অসুধ এবং চিকিৎসা। ততদিনে হয়ত কারো পায়ের আঙ্গুলে পচন ধরেছে, কারো প্যান্টের ঘষায় পা ছুলে ঘাঁ হয়ে গিয়েছে, কারো ময়লা মাখা শরীরে ঘর বেঁধেছে ফাঙ্গাল ইনফেকশন ! সুস্থ হবার পর দশ আঙ্গুলের ছাপ রেখে একখানি গোলাপি রংঙের রিফিউজি কার্ড ধরিয়ে ছেড়ে দেয়া হবে আপনাকে, যাতে লেখা আছে আপনি এই মর্মে প্রত্যয়ন করছেন যে আগামী তিন মাসের মধ্যে টাকা পয়সা জমিয়ে আপনি এই দেশ ত্যাগ করে নিজ দেশে চলে যাবেন! যদিও কেউ তিন মাস পর নিজ দেশে আসে না, টাকার বিনিময়ে উকিল সাহেবেরা বাকি জীবন থাকার বন্দোবস্তটুকু করে দেন।

তবে বর্ডারে এই জামাই আদর এখন আর নেই, তারা ত্যক্ত বিরক্ত হয়ে তুলে ফেলেছে বড় বড় দেয়াল। বর্ডারে পৌঁছালেও দিচ্ছে না ভেতরে যাবার কোনো সুযোগ! তাই সেই ডাংকি কালের বিবর্তনে এখন 'ডাংকি ফ্লাইট' নামে সাগর মহাসাগরে ট্রলারে কিংবা স্থলপথে নতুন নতুন পন্থা খুঁজে নিয়েছে।

আপনাদের ডাংকি ইউরোপ পৌঁছে গিয়েছে, চলে যাচ্ছেন? একটা প্রশ্ন যে রেখেছিলাম আপনাদের কাছে.. গল্প শোনানোর বিনিময়ে এই প্রশ্নের উত্তরটা আমি আপনাদের কাছে দাবি করতেই পারি। আমি আমার উত্তরটা লিখে দিচ্ছি- 

'আমাদের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির গল্প বলার ধরনে অনেক সীমাবদ্ধতা আছে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। তারা প্রতিবারই মৌলিক গল্প নিয়ে এসেছে বলে আমাদের যে বানী শোনায়, সেই মৌলিক গল্পগুলো বরাবরই একই ছাঁচে তৈরি হয়, এক দেশে ছিল এক রাজা, এক রানী আর এক দৈত্য - এই হলো আমাদের কমার্শিয়াল ফিল্মের কাঠামো। এই কাঠামো থেকে বের হয়ে এসে একজন ভাল স্টোরি টেলার আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে বড়ই প্রয়োজন। একটা ফিল্ম যদি তার উপাদান-উপস্থাপন দিয়ে দর্শক টানতে না পারে, তাহলে হলে যান হলে যান, নিজ দেশের সিনেমা বাঁচান অনেকটা অচেনা মুমূর্ষু রোগীকে সাহায্যের আবেদনের মত শোনায়! যাতে বেশিরভাগ লোক সাঁয় দেয় না! এটাই বাস্তবতা। 

অবৈধভাবে বিদেশ যাবার গল্প কমবেশি সবাই জানি আমরা এই যুগে! তবুও আমার এই তিন পর্বের লেখায় কিছু মানুষ কেন আগ্রহ ভরে অপেক্ষায় থেকেছে? একজন সাধারণ মানুষ/দর্শক হিসেবে আমি   যদি এই জেনারেশনের হাজার খানেক মানুষকে আকৃষ্ট করে রাখতে পারি, তাহলে দিন রাত যারা ফিল্ম নিয়ে পড়ে থাকেন তারা কেন বড় পরিসরে একটা ভেলকি দেখাতে পারছেন না?

হিরানীর মুভির মতই বলতে হচ্ছে- 'এক্সিলেন্স, এক্সিলেন্স কে পিছে ভাগো'.. দর্শকের পিছে ভাগার প্রয়োজন নেই। দর্শক তো শা*লা দরজা ভেঙ্গে হলে ভীড় করবে!

পাদটীকা:
[* লেখা বড় হয়ে যাবার কারনে আমি ডাংকি জার্নির অনেক ছোট ছোট ডিটেইলস স্কিপ করে গিয়েছি। তবে সামগ্রিক একটি ধারনা দেয়ার চেষ্টা করেছি ]

[* যাদের মনে প্রশ্ন এসেছে, স্বাধীন চিন্তার কথা বলে আপনি এই পর্বে নিজেই ডিরেক্টর হিরানীর সিনেমার ডায়লগ ব্যবহার করেছেন কয়েকবার, কেন? উত্তর- হিরানী তথা উপমাদেশীয় সিনেমার প্রভাব আমার এক কথায় উবে যাবার কোনো বিষয় না, বরং একটা ভাল সিনেমার জনপ্রিয় কিছু সোশ্যাল মেসেজ কে প্যারালাল রেখে নিজের মনের কথা বলার চেষ্টা করেছি। যাতে সেই মেসেজগুলোর মধ্যে আমার আক্ষেপটুকু আপনাদের স্মৃতিপটে গেঁথে থাকে]

ভুল ত্রুটি ক্ষমা করবেন 🙏
বাংলাদেশী সিনেমার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনায় শেষ করছি আমার লেখা "ডাংকি"

© তুষার অভ্র।
Disclosure: This post May contains affiliate links that support our Blog. When you purchase something after clicking an affiliate link, we may receive a commission. Also Note That We Are Not Responsible For Any Third-party Websites Link Contents
MD: Ashikur Rahman

আমি একজন মুভি ও সিরিজ লাভার। সুপারহিরো জেনরে আমি মার্ভেল ও ডিসি সকলের তৈরী সিনেমাই পছন্দ করি দেখতে। আমার ব্লগ সাইটঃ www.Tvhex.Com চাইলে আমাকে ফেসবুক ও টুইটারে ফলো করতে পারেন। facebook twitter

Post a Comment

আপনাদের কোন কিছু জানার থাকলে আমাদের কে কমেন্ট করে জানাতে পারেন ।



if you have something to say, “Please Comment your Opinion ” Thank You.

Previous Post Next Post